ভ্যানগার্ড ডেস্ক

সংবিধানের বিতর্কিত পঞ্চদশ সংশোধনী আইন পাসের ১ দশক আজ। ২০১১ সালের আজকের দিনে (৩০ জুন) তৎকালীন আওয়ামীলীগ সরকার দেশে বসবাসরত ভিন্ন ভাষাভাষী আদিবাসী জাতিগোষ্ঠীদের উপর উগ্রবাঙালি জাতীয়তা চাপিয়ে দিয়ে সংখ্যাগরিষ্টতার জোরে তড়িঘড়ি করে আইনটি সংসদে পাস করে। পঞ্চদশ সংশোধনীর ষষ্ঠ অনুচ্ছেদের ২-এ বলা হয়েছে “বাংলাদেশের জনগণ জাতি হিসেবে বাঙালি এবং নাগরিকগণ বাংলাদেশী বলিয়া পরিচিতি হইবেন”। যদিও কারা জনগণ আর কারা নাগরিক কিংবা জনগণ ও নাগরিকের মধ্যে পার্থক্য কী তার কোন ব্যাখ্যা সরকার দেয়নি।
পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে কার্যত দেশে বসবাসরত চাকমা, মারমা, ত্রিপুরা, খিয়াং, ম্রো, খুমি, তঞ্চঙ্গ্যা, বম, সান্তাল, গারো, মুনিপুরি, ওঁরাওসহ দেশে বসবাসরত ৫০টির অধিক আদিবাসী জাতিগোষ্ঠীর অস্তিত্বকে অস্বীকার করা হয়েছে।

এখানে আরো উল্লেখ করা প্রয়োজন যে, স্বাধীনতার পর থেকে আওয়ামী লীগ এদেশে বসবাসরত ভিন্ন ভাষাভাষী আদিবাসী জাতিগোষ্ঠীদের বাঙালি বানানোর প্রক্রিয়া শুরু করে। যার কারণে ১৯৭২ সালের সংবিধানেও আওয়ামী লীগ বাংলাদেশের নাগরিকদেরকে “বাঙালি” হিসেবে অভিহিত করেছিল। পার্বত্য চট্টগ্রামের নেতৃবৃন্দ এর বিরুদ্ধে সে সময় সংসদের ভেতরে ও বাইরে তীব্র প্রতিবাদ করেছিলেন। সে সময় সংসদে দাঁড়িয়ে পার্বত্য চট্টগ্রাম-১ আসন থেকে নির্বাচিত সাংসদ মানবেন্দ্র নারায়ণ লারমা এর তীব্র প্রতিবাদ জানিয়ে বলেছিলেন, “মাননীয় স্পীকার, একজন বাঙালি যেমন কোনদিন চাকমা হতে পারে না, অনুরূপ একজন চাকমাও কখনও বাঙালি হতে পারে না’’ এই বলে তিনি প্রতিবাদ স্বরূপ সংসদ কক্ষ থেকে বের হয়ে যান। বাঙালি জাতীয়তাবাদ চাপিয়ে দেওয়ার প্রতিবাদে তিনি ’৭২-এ সংসদে গৃহিত সংবিধান আইনে স্বাক্ষর করেননি বলেও জানা যায়।
তবে পরবর্তীতে ক্ষমতার পালাবদল ঘটলে বিএনপি ক্ষমতায় এসে সংবিধান থেকে বাঙালি জাতীয়তাবাদ রহিত করে তার পরিবর্তে বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদ অন্তর্ভুক্ত করে। দীর্ঘ ৩৯ বছর পর ২০১১ সালে আওয়ামী লীগ ’৭২ এর সংবিধান পুনপ্রবর্তনের কথা বলে পূনরায় সংবিধানে বাঙালি জাতীয়তাবাদ অন্তর্ভুক্ত করে সংখ্যাগরিষ্টতার জোরে সংসদে ‘পঞ্চদশ সংশোধনী আইন’ পাস করে। এতে দেখা গেল, পার্বত্য চট্টগ্রাম থেকে নির্বাচিত সংসদ সদস্যরা এর প্রতিবাদতো করেনইনি, বরং টেবিল চাপড়িয়ে এর সমর্থন দিয়েছেন। যে দলিলে তাদেরকে ও তাদের নিজ নিজ জাতির জনগণকে বাঙালি বলে হেয় ও অবজ্ঞা করা হয়েছে সে দলিলে তারা বিনা দ্বিধায় স্বাক্ষর করেছেন! এটা জাতির জন্য বড়ই লজ্জার।
বিতর্কিত এই পঞ্চদশ সংশোধনী বহাল রাখতে পারলে সরকার ভবিষ্যতে দলিল-দস্তাবেজসহ সবখানে ভিন্ন ভাষাভাষি ও ধর্মীয় জাতিসত্তাগুলোকে বাঙালি পরিচয় দিতে জোরজবরদস্তি করবে না তার কোন নিশ্চিয়তা নেই।
তাই সংবিধানের এই বিতর্কিত পঞ্চদশ সংশোধনী বাতিলের দাবিতে এবং পার্বত্য চট্টগ্রামসহ দেশের সকল ভিন্ন ভাষাভাষী আদিবাসী জাতিগোষ্ঠীগুলোকে চাপিয়ে দেওয়া উগ্রবাঙালি জাতীয়তার বিরুদ্ধে সোচ্চার হতে হবে এবং লড়াই-সংগ্রাম গড়ে তুলতে হবে।